০২:৩৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

রোজা নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল

সংগৃহীত ছবি

রমজান মাসে যারা রোজা রাখেন, তারা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কিছুই মুখে দেন না। এ দীর্ঘ সময়ে অনেক কিছুকেই রোজা ভাঙার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন সাধারণ মুসলমানরা। কিন্তু ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, রোজা ভাঙার মূল কারণ আসলে পাঁচটি। সেগুলো হলো- ইচ্ছাকৃতভাবে খাবার খেলে, ইচ্ছাকৃতভাবে পান করলে,শরীর থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়লে, মুখ ভর্তি বমি হলে ও রোজা রাখা অবস্থায় সঙ্গীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম বলেছেন, ‘রক্তপাত বা বমি হলে রোজাদার ব্যক্তি অসুস্থ বোধ করতে পারেন। সেজন্যই ধর্মে এসব ক্ষেত্রে রোজা ভেঙে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।’

এই পাঁচ কারণের বাইরে আরও কিছু বিষয়কে রোজা ভাঙ্গার কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়। কিন্তু সেগুলো আদতে রোজা ভাঙ্গার মতো কোনো কারণই নয়। বরং সমাজে প্রচিলত থাকার কারণে রোজাদাররা সেগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। এতে করে তিনি নিজে যেমন কষ্টে থাকেন, সেইসঙ্গে তার চারপাশের মানুষকেও বিড়ম্বনায় ফেলেন।

এবার জেনে নিন রোজা নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা সম্পর্কে-

মুখের লালা গিলে ফেললে রোজা ভেঙে যায়

মুখের লালা যদি পেটে চলে যায়, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে; এটি একটি বহুল চর্চিত কথা।এই প্রচলিত ধারণার কারণে রমজানে মানুষ যেখানে সেখানে থু থু ফেলে। এতে করে রোজাদার ব্যক্তিটি একদিকে যেমন পরিবেশের ক্ষতি করছেন, অন্যদিকে তিনি পাশের মানুষকেও অস্বস্তিতে ফেলছেন।

এ বিষয়ে অধ্যাপক শামছুল আলম বলেন, ‘মুখের লালা গিলে ফেললে কিচ্ছু হয় না রোজার। এ বিষয়ে ধর্মে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই অর্থাৎ ইন্টার্নাল কিছু পেটে ঢুকলে রোজা ভেঙে যাবে না।’

তবে অন্য কারও মুখের লালা যদি নিজের মুখে যায়, তাহলে রোজা থাকবে না। অর্থাৎ রোজা পালন করা অবস্থায় সঙ্গীকে চুমু খাওয়া যাবে না।

দাঁত ব্রাশ করা যাবে না

অনেকে বলেন, রোজা রাখা অবস্থায় দাঁতও ব্রাশ করা যাবে না। কিন্তু দীর্ঘ সময় দাঁত ব্রাশ না করার কারণে মুখে দুর্গন্ধ তৈরি হয় এবং তাতে কথা বলার সময় চারপাশে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।কিন্তু এই গন্ধ বিষয়ে অনেক রোজাদারকে বলতে শোনা যায়, রোজাদার ব্যক্তির মুখের গন্ধও ভালো বা রোজাদার ব্যক্তির মুখের গন্ধে বিরক্ত হওয়া যাবে না।

কিন্তু এ বিষয়ে অধ্যাপক শামছুল আলম শুরুতেই এক বাক্যে বলেন, ‘দাঁত ব্রাশ করলে রোজার কিচ্ছু হবে না। তবে পেস্ট আছে তো, ভুলে গলায় চলেও যেতে পারে। পেস্ট গলায় গেলে রোজা মাকরূহ হবে। সেজন্য এটা সাহরি খাওয়ার আগে করাই ভালো।’

সুতরাং কেউ যদি সাবধানতা বজায় রেখে অল্প পরিমাণ পেস্ট নিয়ে দাঁত ব্রাশ করেন, তাতে সমস্যা নেই।

নখ ও চুল কাটা যাবে না

এ রকম প্রচলিত আরেকটা ধারণা হলো, রোজা রাখা অবস্থায় কিছুতেই নখ ও চুল কাটা যাবে না।তবে ‘নখ, চুল কাটা যাবে না; এটা একদম ভুল কথা’ বলে জানান অধ্যাপক শামছুল আলম।কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘এগুলোতে তো রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে না। আর এগুলো সাধারণত দিনের বেলাতেই মানুষ করে এবং একই সঙ্গে রোজাও মানুষ দিনের বেলাতেই রাখে।’

দাড়ি কামানো যাবে না

রোজা রাখলে পুরুষরা দিনে দাড়ি কামাতে পারবেন না, এমন একটি মিথও প্রচলিত আছে।কিন্তু বাস্তবে তারা যেকোনো সময়েই দাড়ি কামাতে পারবেন। এ নিয়ে কোনো বাধা-নিষেধ নেই। তবে দাড়ি কামানোর সময় শুধুমাত্র একটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে যে গাল কেটে গিয়ে রক্ত না গড়ায়।

রমজানে যৌন সম্পর্ক করা যাবে না

কেউ কেউ মনে করেন, পুরো রমজান মাসে সঙ্গীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে না। কিন্তু যৌন সম্পর্ক স্থাপনের বিধিনিষেধ শুধুমাত্র রোজা থাকা অবস্থায়। আর মানুষ রোজা রাখে দিনের বেলায়।তাই রোজা না থাকলে রমজানে সঙ্গীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে কোনো বাধা নেই।

সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে না

অনেকের মতে, রোজা রেখে সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু মানুষের মনে গেঁথে থাকা এই ধারণাকেও ভিত্তিহীন বলে জানান অধ্যাপক শামছুল আলম।তিনি বলেন, ‘সুগন্ধি বলতে আতর ব্যবহার করা যাবে, এটা তো নবীর সুন্নত। যুগে যুগে নবী রাসূলরা আতর ব্যবহার করে গেছেন। এটা ব্যবহারে কোনো নিষেধ নেই।’

তবে পারফিউমও ব্যবহার করা যাবে কি না, এমন এক প্রশ্নের মুখে তিনি বলেন, ‘পারফিউম ব্যবহারের বিষয়ে এক ধরনের সতর্কতা আছে। কারণ পারফিউম তৈরিতে নাকি চর্বি ব্যবহৃত হয়। এটা তো আমরা জানি না। তাই এটা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকলেই বেশি ভালো হয়, শুধু আতর ব্যবহার করা ভালো।’

তবে তিনি এও বলেন, ‘কিন্তু আপনি পারফিউম ব্যবহার করতে পারেন, কারণ এটি তৈরির সময় তো আপনি দেখেননি। তবে বেশি তাকওয়া (ধার্মিকতা বা ধর্মপরায়ণতা) দেখাতে চাইলে দিনের বেলা ব্যবহার না করাই ভালো। একদমই ব্যবহার না আরও ভালো।’

‘ভুল করে’ পানাহার করে ফেললে রোজা ভাঙে

অনেক সময় এমন হয় যে একজন ব্যক্তি সারাদিন ধরে রোজা আছেন। কিন্তু হঠাৎ হয়তো মনের ভুলে তিনি খাবার খেয়ে ফেললেন বা পানি পান করলেন।

কিন্তু সম্বিৎ ফিরে পাওয়ার পর ওই রোজাদার ব্যক্তি ভাবেন যে তার রোজা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে গেছে। এটা ভেবে হয়তো তখন তিনি পরিপূর্ণ আহারই করে ফেলেন।

এ প্রসঙ্গে ঢাবির অধ্যাপক বলেন,‘মনের ভুলে ভরপেট খাবার খেলেও রোজা ভেঙে যাওয়ার কথা ইসলামে বলা হয়নি। এতে রোজা মাকরূহ হতে পারে। রোজা ভেঙে যাবে, যদি ব্যক্তি ইচ্ছা করে পানাহার করে।’

এখানে মাকরূহ অর্থকে তিনি ব্যাখ্যা করেন এভাবে, ‘মাকরূহ মানে অপছন্দনীয়। মাকরূহ মানে- রোজা হয়ে যাবে, কিন্তু রোজার সৌন্দর্যবোধটা শতভাগ হলো না।’ তিনি বলেন, ‘মুখে খাবার নেওয়ার পর যখনই মনে আসবে, তখন ফেলে দিতে হবে। আর গেলা যাবে না।’

রোজা রেখে ওষুধ খাওয়া যাবে না

অনেক মিথের ভীড়ে আরেকটি মিথ হলো, রোজা রেখে কিছুতেই ওষুধ সেবন করা যাবে না।যদিও এর আগে মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেন (এমসিবি) আন্তর্জাতিক গ্লুকোমা সমিতির সঙ্গে যৌথ একটি বিবৃতি দিয়ে বলেছে, রোজা রেখেও কিছু ওষুধ ব্যবহার করা যাবে। যেমন- চোখের ড্রপ।

ঢাবি অধ্যাপক বলেন, ‘যে ওষুধ পেটে যায়, মানে ক্ষুধা কমায়, সেগুলা নিষেধ। কিন্তু নাকে বা চোখে কোনো ড্রপ দিলে, সেটাতে কোনো সমস্যা নাই।’

যেসব ওষুধ গিলে খেতে হবে, সেগুলো ইফতারের পরে বা সাহরির আগে খাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তবে পেনিসিলিন, ইনজেকশন, ইনসুলিন অথবা টিকা দেওয়া যাবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ইনসুলিন ইফতারর আগ মুহূর্তে নিতে হবে। তবে ইমার্জেন্সি হলে সব বৈধ।’

‘মৃত্যুর আশঙ্কা থাকলে, স্বাস্থ্যের অবনতির আশঙ্কা থাকলে ইসলামে সব বৈধ, যোগ করেন অধ্যাপক শামছুল আলম।

রোজা রেখে ধূমপান করা যাবে

অবাক লাগলেও এটি সত্য যে অনেকে মনে করেন যে সিগারেট তো কোনো খাবার বা মাদক না, তাই রোজা রাখা অবস্থায় ধূমপান করা হলে রোজা ভেঙে যাওয়ার কোনো বিষয় নেই।

এ বিষয়ে ঢাবির অধ্যাপক বলেন, ‘ধূমপান শুধু রোজা থাকা অবস্থায় না, রোজা ছাড়াও হারাম। মাদকদ্রব্য অন্যের ক্ষতি করে না, এটি শুধু সেবনকারীর ক্ষতি করে। তারপরও মাদকদ্রব্য হারাম।’

তিনি বলেন, ‘সেখানে ধূমপান নিজের ক্ষতি তো করেই, অন্যেরও ক্ষতি করে। এটি বাতাসে ছড়িয়ে যাচ্ছে। এটা রোজায় না কেবল, রোজা ছাড়াও খাওয়া ঠিক না। আর যে ধূমপান করছে, সে তো এটা খেয়ে তৃপ্তি পাচ্ছে। অনেকে ভাতের পরিবর্তে সিগারেট খায়। তাই এটি খেলে রোজা ভেঙে যাবে।’

রান্নার সময় খাবারের স্বাদ গ্রহণ করা যাবে না

যিনি রান্না করেন, তাকে অনেক সময় রান্নার স্বাদ বোঝার জন্য কিছুটা খাবার খেয়ে দেখতে হয়।বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘরের রান্নাঘর সামলানোর কাছে নারীদের অংশগ্রহণই বেশি থাকে। তাই প্রায় প্রত্যেকের ঘরের মা বা বোন রান্নার সময় লবণ, ঝাল ইত্যাদি পরখ করে দেখেন।

কিন্তু এ রকম কথাও অনেকে বলেন যে রোজা রেখে খাবারের স্বাদ গ্রহণ করলে রোজা মাকরূহ হয়ে যায়।এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আলম বলেন, ‘খাবারের স্বাদ নেওয়া যাবে। লবণ, ঝাল বা স্বাদ বোঝার জন্য জিহ্বায় লাগানো যায়, এরপর ফেলে দিতে হবে। রান্নাবান্না থেকে তো আর দূরে থাকা যাবে না।’

তবে তিনি এও বলেন যে, ঘরে যদি কম বয়সী বা রোজা রাখেনি, এমন কেউ থাকে; তাদেরকে দিয়ে খাবারের স্বাদ টেস্ট করালে সবচেয়ে ভালো হয়। সূত্র: বিবিসি বাংলা

জনপ্রিয় খবর

জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশে পরিপূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাবে- আমিনুল হক

রোজা নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল

সর্বশেষ আপডেট : ০২:৫৯:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ মার্চ ২০২৫

সংগৃহীত ছবি

রমজান মাসে যারা রোজা রাখেন, তারা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কিছুই মুখে দেন না। এ দীর্ঘ সময়ে অনেক কিছুকেই রোজা ভাঙার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন সাধারণ মুসলমানরা। কিন্তু ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, রোজা ভাঙার মূল কারণ আসলে পাঁচটি। সেগুলো হলো- ইচ্ছাকৃতভাবে খাবার খেলে, ইচ্ছাকৃতভাবে পান করলে,শরীর থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়লে, মুখ ভর্তি বমি হলে ও রোজা রাখা অবস্থায় সঙ্গীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম বলেছেন, ‘রক্তপাত বা বমি হলে রোজাদার ব্যক্তি অসুস্থ বোধ করতে পারেন। সেজন্যই ধর্মে এসব ক্ষেত্রে রোজা ভেঙে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।’

এই পাঁচ কারণের বাইরে আরও কিছু বিষয়কে রোজা ভাঙ্গার কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়। কিন্তু সেগুলো আদতে রোজা ভাঙ্গার মতো কোনো কারণই নয়। বরং সমাজে প্রচিলত থাকার কারণে রোজাদাররা সেগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। এতে করে তিনি নিজে যেমন কষ্টে থাকেন, সেইসঙ্গে তার চারপাশের মানুষকেও বিড়ম্বনায় ফেলেন।

এবার জেনে নিন রোজা নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা সম্পর্কে-

মুখের লালা গিলে ফেললে রোজা ভেঙে যায়

মুখের লালা যদি পেটে চলে যায়, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে; এটি একটি বহুল চর্চিত কথা।এই প্রচলিত ধারণার কারণে রমজানে মানুষ যেখানে সেখানে থু থু ফেলে। এতে করে রোজাদার ব্যক্তিটি একদিকে যেমন পরিবেশের ক্ষতি করছেন, অন্যদিকে তিনি পাশের মানুষকেও অস্বস্তিতে ফেলছেন।

এ বিষয়ে অধ্যাপক শামছুল আলম বলেন, ‘মুখের লালা গিলে ফেললে কিচ্ছু হয় না রোজার। এ বিষয়ে ধর্মে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই অর্থাৎ ইন্টার্নাল কিছু পেটে ঢুকলে রোজা ভেঙে যাবে না।’

তবে অন্য কারও মুখের লালা যদি নিজের মুখে যায়, তাহলে রোজা থাকবে না। অর্থাৎ রোজা পালন করা অবস্থায় সঙ্গীকে চুমু খাওয়া যাবে না।

দাঁত ব্রাশ করা যাবে না

অনেকে বলেন, রোজা রাখা অবস্থায় দাঁতও ব্রাশ করা যাবে না। কিন্তু দীর্ঘ সময় দাঁত ব্রাশ না করার কারণে মুখে দুর্গন্ধ তৈরি হয় এবং তাতে কথা বলার সময় চারপাশে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।কিন্তু এই গন্ধ বিষয়ে অনেক রোজাদারকে বলতে শোনা যায়, রোজাদার ব্যক্তির মুখের গন্ধও ভালো বা রোজাদার ব্যক্তির মুখের গন্ধে বিরক্ত হওয়া যাবে না।

কিন্তু এ বিষয়ে অধ্যাপক শামছুল আলম শুরুতেই এক বাক্যে বলেন, ‘দাঁত ব্রাশ করলে রোজার কিচ্ছু হবে না। তবে পেস্ট আছে তো, ভুলে গলায় চলেও যেতে পারে। পেস্ট গলায় গেলে রোজা মাকরূহ হবে। সেজন্য এটা সাহরি খাওয়ার আগে করাই ভালো।’

সুতরাং কেউ যদি সাবধানতা বজায় রেখে অল্প পরিমাণ পেস্ট নিয়ে দাঁত ব্রাশ করেন, তাতে সমস্যা নেই।

নখ ও চুল কাটা যাবে না

এ রকম প্রচলিত আরেকটা ধারণা হলো, রোজা রাখা অবস্থায় কিছুতেই নখ ও চুল কাটা যাবে না।তবে ‘নখ, চুল কাটা যাবে না; এটা একদম ভুল কথা’ বলে জানান অধ্যাপক শামছুল আলম।কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘এগুলোতে তো রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে না। আর এগুলো সাধারণত দিনের বেলাতেই মানুষ করে এবং একই সঙ্গে রোজাও মানুষ দিনের বেলাতেই রাখে।’

দাড়ি কামানো যাবে না

রোজা রাখলে পুরুষরা দিনে দাড়ি কামাতে পারবেন না, এমন একটি মিথও প্রচলিত আছে।কিন্তু বাস্তবে তারা যেকোনো সময়েই দাড়ি কামাতে পারবেন। এ নিয়ে কোনো বাধা-নিষেধ নেই। তবে দাড়ি কামানোর সময় শুধুমাত্র একটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে যে গাল কেটে গিয়ে রক্ত না গড়ায়।

রমজানে যৌন সম্পর্ক করা যাবে না

কেউ কেউ মনে করেন, পুরো রমজান মাসে সঙ্গীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে না। কিন্তু যৌন সম্পর্ক স্থাপনের বিধিনিষেধ শুধুমাত্র রোজা থাকা অবস্থায়। আর মানুষ রোজা রাখে দিনের বেলায়।তাই রোজা না থাকলে রমজানে সঙ্গীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে কোনো বাধা নেই।

সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে না

অনেকের মতে, রোজা রেখে সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু মানুষের মনে গেঁথে থাকা এই ধারণাকেও ভিত্তিহীন বলে জানান অধ্যাপক শামছুল আলম।তিনি বলেন, ‘সুগন্ধি বলতে আতর ব্যবহার করা যাবে, এটা তো নবীর সুন্নত। যুগে যুগে নবী রাসূলরা আতর ব্যবহার করে গেছেন। এটা ব্যবহারে কোনো নিষেধ নেই।’

তবে পারফিউমও ব্যবহার করা যাবে কি না, এমন এক প্রশ্নের মুখে তিনি বলেন, ‘পারফিউম ব্যবহারের বিষয়ে এক ধরনের সতর্কতা আছে। কারণ পারফিউম তৈরিতে নাকি চর্বি ব্যবহৃত হয়। এটা তো আমরা জানি না। তাই এটা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকলেই বেশি ভালো হয়, শুধু আতর ব্যবহার করা ভালো।’

তবে তিনি এও বলেন, ‘কিন্তু আপনি পারফিউম ব্যবহার করতে পারেন, কারণ এটি তৈরির সময় তো আপনি দেখেননি। তবে বেশি তাকওয়া (ধার্মিকতা বা ধর্মপরায়ণতা) দেখাতে চাইলে দিনের বেলা ব্যবহার না করাই ভালো। একদমই ব্যবহার না আরও ভালো।’

‘ভুল করে’ পানাহার করে ফেললে রোজা ভাঙে

অনেক সময় এমন হয় যে একজন ব্যক্তি সারাদিন ধরে রোজা আছেন। কিন্তু হঠাৎ হয়তো মনের ভুলে তিনি খাবার খেয়ে ফেললেন বা পানি পান করলেন।

কিন্তু সম্বিৎ ফিরে পাওয়ার পর ওই রোজাদার ব্যক্তি ভাবেন যে তার রোজা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে গেছে। এটা ভেবে হয়তো তখন তিনি পরিপূর্ণ আহারই করে ফেলেন।

এ প্রসঙ্গে ঢাবির অধ্যাপক বলেন,‘মনের ভুলে ভরপেট খাবার খেলেও রোজা ভেঙে যাওয়ার কথা ইসলামে বলা হয়নি। এতে রোজা মাকরূহ হতে পারে। রোজা ভেঙে যাবে, যদি ব্যক্তি ইচ্ছা করে পানাহার করে।’

এখানে মাকরূহ অর্থকে তিনি ব্যাখ্যা করেন এভাবে, ‘মাকরূহ মানে অপছন্দনীয়। মাকরূহ মানে- রোজা হয়ে যাবে, কিন্তু রোজার সৌন্দর্যবোধটা শতভাগ হলো না।’ তিনি বলেন, ‘মুখে খাবার নেওয়ার পর যখনই মনে আসবে, তখন ফেলে দিতে হবে। আর গেলা যাবে না।’

রোজা রেখে ওষুধ খাওয়া যাবে না

অনেক মিথের ভীড়ে আরেকটি মিথ হলো, রোজা রেখে কিছুতেই ওষুধ সেবন করা যাবে না।যদিও এর আগে মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেন (এমসিবি) আন্তর্জাতিক গ্লুকোমা সমিতির সঙ্গে যৌথ একটি বিবৃতি দিয়ে বলেছে, রোজা রেখেও কিছু ওষুধ ব্যবহার করা যাবে। যেমন- চোখের ড্রপ।

ঢাবি অধ্যাপক বলেন, ‘যে ওষুধ পেটে যায়, মানে ক্ষুধা কমায়, সেগুলা নিষেধ। কিন্তু নাকে বা চোখে কোনো ড্রপ দিলে, সেটাতে কোনো সমস্যা নাই।’

যেসব ওষুধ গিলে খেতে হবে, সেগুলো ইফতারের পরে বা সাহরির আগে খাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তবে পেনিসিলিন, ইনজেকশন, ইনসুলিন অথবা টিকা দেওয়া যাবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ইনসুলিন ইফতারর আগ মুহূর্তে নিতে হবে। তবে ইমার্জেন্সি হলে সব বৈধ।’

‘মৃত্যুর আশঙ্কা থাকলে, স্বাস্থ্যের অবনতির আশঙ্কা থাকলে ইসলামে সব বৈধ, যোগ করেন অধ্যাপক শামছুল আলম।

রোজা রেখে ধূমপান করা যাবে

অবাক লাগলেও এটি সত্য যে অনেকে মনে করেন যে সিগারেট তো কোনো খাবার বা মাদক না, তাই রোজা রাখা অবস্থায় ধূমপান করা হলে রোজা ভেঙে যাওয়ার কোনো বিষয় নেই।

এ বিষয়ে ঢাবির অধ্যাপক বলেন, ‘ধূমপান শুধু রোজা থাকা অবস্থায় না, রোজা ছাড়াও হারাম। মাদকদ্রব্য অন্যের ক্ষতি করে না, এটি শুধু সেবনকারীর ক্ষতি করে। তারপরও মাদকদ্রব্য হারাম।’

তিনি বলেন, ‘সেখানে ধূমপান নিজের ক্ষতি তো করেই, অন্যেরও ক্ষতি করে। এটি বাতাসে ছড়িয়ে যাচ্ছে। এটা রোজায় না কেবল, রোজা ছাড়াও খাওয়া ঠিক না। আর যে ধূমপান করছে, সে তো এটা খেয়ে তৃপ্তি পাচ্ছে। অনেকে ভাতের পরিবর্তে সিগারেট খায়। তাই এটি খেলে রোজা ভেঙে যাবে।’

রান্নার সময় খাবারের স্বাদ গ্রহণ করা যাবে না

যিনি রান্না করেন, তাকে অনেক সময় রান্নার স্বাদ বোঝার জন্য কিছুটা খাবার খেয়ে দেখতে হয়।বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘরের রান্নাঘর সামলানোর কাছে নারীদের অংশগ্রহণই বেশি থাকে। তাই প্রায় প্রত্যেকের ঘরের মা বা বোন রান্নার সময় লবণ, ঝাল ইত্যাদি পরখ করে দেখেন।

কিন্তু এ রকম কথাও অনেকে বলেন যে রোজা রেখে খাবারের স্বাদ গ্রহণ করলে রোজা মাকরূহ হয়ে যায়।এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আলম বলেন, ‘খাবারের স্বাদ নেওয়া যাবে। লবণ, ঝাল বা স্বাদ বোঝার জন্য জিহ্বায় লাগানো যায়, এরপর ফেলে দিতে হবে। রান্নাবান্না থেকে তো আর দূরে থাকা যাবে না।’

তবে তিনি এও বলেন যে, ঘরে যদি কম বয়সী বা রোজা রাখেনি, এমন কেউ থাকে; তাদেরকে দিয়ে খাবারের স্বাদ টেস্ট করালে সবচেয়ে ভালো হয়। সূত্র: বিবিসি বাংলা